পর্ব ৫: একেবারে অন্য মানুষ হয়ে গেল

পুনর্জন্মের পর, গবেষণার অগ্রগামী মা তাঁর সন্তানদের নিয়ে নতুন ভুবন গড়ে তুললেন। ভাঙ্গা পাতার শীতল হোলি 2509শব্দ 2026-02-09 11:18:00

কিনিউত জলসিদ্ধ করে মাশরুমগুলোকে একটু নেড়ে ভাজলেন, ওপর থেকে ছিটিয়ে দিলেন কিছু খসা লবণ। কেউ খেয়াল করছে না দেখে, তিনি চুপচাপ অন্য কিছু মসলা মিশিয়ে দিলেন।
যদিও তিনি খাবার বিষয়ে অতটা খুঁতখুঁতে নন, তবুও একেবারে অনাদরে খেতে মন চায় না।
সাধারণ মাশরুম সেদ্ধ হতেই রান্নাঘর ভরে গেল সুগন্ধে, চোখে না দেখলেও বোঝা যায়, দরজার পর্দার ফাঁক দিয়ে চারটি ছোট মাথা উঁকি দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছে।
মাশরুম তুলে রাখা গেল ফাটা বড় চীনামাটির বাটিতে, এরপর সেটি তুলে নিয়ে তিনি গেলেন পশ্চিম ঘরে।
ঘরে ঢুকতেই আবার সেই শীতল দৃষ্টির সম্মুখীন হলেন।
যদিও তিনি বুঝতে পারছেন, কিন্তু কিনিউত সারাক্ষণ এমন নজরবন্দি থাকতে চান না।
পিঁড়ি বিছিয়ে রাখলেন, বহু ব্যবহারে পিঁড়ির চার পা অসমান হয়ে গেছে, দুলছে এদিক-ওদিক। কিনিউত কাঠের টুকরো দিয়ে ঠেস দিয়ে ঠিক করলেন, তারপর সস্তা স্বামীর পাশে গিয়ে তাকে উঠতে সাহায্য করতে চাইলেন।
পুরুষটির শীতল চোখেমুখে স্পষ্ট ঘৃণা, কড়া গলায় বলল, ‘‘সরে যা!’’
কিনিউতের হাত মাঝ আকাশে থেমে গেল, মনে মনে একটু বিরক্তি অনুভব করলেন।
বুঝতে পারছেন, তবুও এসব তাঁর করা কোনো কাজ নয়।
‘‘খাবেন, না খাবেন?’’ কিনিউত স্পষ্ট স্বরে জিজ্ঞেস করলেন।
পুরুষটি তাঁর এই দৃঢ়তায় অবাক, মনে মনে ভাবল, তবে কি বুঝতে পেরেছে, এখন তিনি আর তাকে কিছু করতে পারবেন না বলেই এই পরিবর্তন?
কিনিউত দেখলেন, সে চুপচাপ, তিনি ফিরে গিয়ে পিঁড়ির কিনারে বসে বাটিতে খাবার ও কাঠের চামচ সাজিয়ে বললেন, ‘‘চলো, খাওয়া শুরু করি।’’
বলেই শুধু তিনি নিজেই খেতে লাগলেন, চারটি ছোট মুখ অদ্ভুত মুখভঙ্গিতে চুপচাপ বসে রইল।
সবচেয়ে বড়টি বলল, ‘‘বাবা না খেলে আমরাও খাব না।’’
কিনিউত শান্ত স্বরে ‘ও’ বলে নিজের খাওয়া চালিয়ে গেলেন, কোনো তোয়াক্কা না করেই।
খাবার তৈরি হয়ে গেছে, এখন আর কারও আদিখ্যেতা সহ্য করার প্রয়োজন নেই, তিনি কখনোই কারো বাজে অভ্যাসে প্রশ্রয় দেন না।
এখনই এখান থেকে চলে যাওয়ার ইচ্ছে নেই কিনিউতের; এক তো এই জায়গা তাঁর কাছে অচেনা, পুরো পৃথিবীটাই বদলে গেছে, হুট করে চলে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
আরেকটা কথা, তিনি চলে গেলে এই চারটি শিশুর প্রায় নিশ্চিত মৃত্যু হবে।
নিজেকে খুব ভালো মানুষ মনে করেন না কিনিউত, তবুও সামর্থ্যের মধ্যে থাকলে সাহায্য করতে প্রস্তুত।
সব দিক ভেবে, এখানেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
একই ছাদের নিচে থাকতে হলে, সবার সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে থাকা উচিত, অকারণ অশান্তি না করাই ভালো।
পুরুষটি ধীরে ধীরে বুঝতে পারল, এই নারী আসলে তাঁকে খেতে সাহায্য করতে এসেছিলেন?
তিনি তো আগে নিজের পেট ভরে নিয়ে, বাচ্চাদের জন্য কেবল অবশিষ্টাংশ রাখতেন না?
‘‘তোমরা চারজন খাও।’’
পুরুষটির কণ্ঠ গভীর, মদিরার মতো টানাটানা, বড়ই মধুর শোনায়।
কিন্তু ছোটরা জানে, তারা খেলে ওই নারী বাবার জন্য কিছু রাখবে না।
পুরুষটি নিরুপায়, শেষ পর্যন্ত নিজেই উঠে খেতে বসলো, তখনই ছোট চারটি আনন্দে খাওয়া শুরু করল।

খেতে খেতে পুরুষটির মনে সন্দেহ, এই নারী হঠাৎ এত সদয় হয়ে চারটি শিশুর জন্য গরম খাবার দিল কেন?
মাশরুম মুখে দিতেই সেও থমকে গেল।
এখনও অবাক হয়ে দ্বিতীয় চামচ মুখে তুলে নিল।
কয়েক চামচ খাওয়ার পর নিজেকে সামলে নিয়ে একটু অস্বস্তিতে চোখ তুলে দেখে, গ্রামের মেয়েটি মাথা নিচু করে খাচ্ছে, তার দিকে তাকায়নি, আর বাকি ছোটগুলোও তারই মতো ভাব।
কৃষ্ণবর্ণ চোখে মেয়েটির দিকে তাকাল।
সে কেন জানত না, মেয়েটির রান্না এত সুস্বাদু?
টানা অবাকিতে সে না চেয়ে মেয়েটির দিকে কয়েকবার তাকাল, এবার আবার নতুন কিছু নজরে এলো।
আগে মেয়েটির মুখে ছিলো কেবল অভিমান, চোখে ছিলো নিরুত্তাপ শূন্যতা, একরকম ফ্যাকাসে ভাব।
আর এখন? ভ্রু-কপালে ভরসা, চলাফেরায় সাহস, চোখে দীপ্তি, এমনকি তার চোখে চোখ পড়লেও লজ্জা নেই, হার মানারও কোনো লক্ষণ নেই।
দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে পুরুষটি ভ্রু কুঁচকে নিল, একটু বসতেই অস্বস্তি অনুভব করল।
‘‘খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ুন, বেশিক্ষণ বসা শরীরের জন্য ক্ষতিকর।’’
কথা বলার ভঙ্গি স্থির, দৃঢ়, যেন এই বিষয়ে তাঁর ভালো জ্ঞান আছে।
পুরুষটির মুখে বিষণ্ন ছায়া, কিছু না বলে, বড় ছেলের সাহায্যে ধীরে ধীরে শুয়ে পড়ল।
ভাবল, সারাজীবন কি তবে বিছানাতেই কাটাতে হবে? সে মানতে পারছে না।
তার এখনো অনেক কিছু করার বাকি।
কিনিউত তার মুখের ভাব লক্ষ্য করলেন, কিছু বললেন না, দেখলেন বড় চীনামাটির বাটিতে ভাজা মাশরুম প্রায় শেষ, শিশুগুলো এমনকি ঝোলটুকুও ভাগ করে নিয়েছে, তিনি চুপচাপ সব তুলে ধুতে গেলেন।
তিনি পেছনের উঠোনে কিছু সবজি চাষ করার ভাবছেন, প্রতিদিনই野মাশরুম খেয়ে থাকা চলে না।
বিকেলের দিকে, সূর্য ডুবে যাওয়ার সময়, গ্রামে অনেক বয়স্কা নারী দল বেঁধে গল্পে মেতে উঠেছে।
গল্প জমে উঠতেই, তাঁরা কিনিউতকে আসতে দেখে কথা থামিয়ে দিলেন, দৃষ্টি সরাসরি তার দিকে, তারপর তাকে অবজ্ঞার চোখে দেখিয়ে নতুন আলোচনা শুরু করলেন।
এবার তাঁদের আলোচনায় নতুন বিষয় যোগ হলো।
বৃদ্ধ প্রধান ফ্যান হাতে নিয়ে প্রতিবেশী বৃদ্ধের সঙ্গে গল্প করছিলেন, কিনিউতকে দেখে অবাক হলেন।
‘‘কী চাই?’’ বৃদ্ধ প্রধান তাঁকে দেখেই কপালে ভাঁজ ফেললেন।
কিনিউত বিনয়ের সঙ্গে বললেন, ‘‘চাচা, ভেতরে আসতে পারি?’’
বৃদ্ধ প্রধান অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাঁকে ভেতরে ঢুকতে দিলেন।
‘‘টাকা তো নেই, সে আশা করো না, বারবার এসে কান্নাকাটি না করে বরং কীভাবে বাঁচবে সেটা ভেবো।’’
তাঁর দিন যায় কষ্টে, তবুও তা মানে এই নয়, চলা যাবে না।
প্রথম দিকে দু’একবার তিনি দয়া দেখালেও, বারবার এলে বিরক্তি ধরে, কার বাড়ি বা গ্রামই বা অঢেল?
তার ওপর, কিনি পরিবারের লোকজন স্বাদ পেয়ে গেছেন, পরে তো কিনি মা নিজেই কিনিউতকে কান্নাকাটি করতে পাঠাতেন, এসব জানার পর তিনি প্রায় রেগে মরেছেন।

কিনিউত কিছু মনে করলেন না, বললেন, ‘‘চাচা, আমি আসলে কিছু শস্যবীজ ধার চাইতে এসেছি, নিয়ম অনুযায়ী, দুই বছর পর দ্বিগুণ ফসল দিয়ে ফেরত দেবো।’’
এই কথা শুনে বৃদ্ধ প্রধান অবাক, নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলেন না।
এতদিনে কী এই মেয়ে শ্রমের স্বাদ পেয়েছে?
তবে একটি বিষয়ে নিশ্চিত, এই ধার চাওয়ার পেছনে কিনি মায়ের উস্কানি নেই।
‘‘তুই জমি চাষ করতে চাস?’’ বৃদ্ধ প্রধান প্রশ্ন করলেন।
কিনিউত মাথা নেড়ে বললেন, ‘‘এখন দা থিয়ান বিছানায় পড়ে, লেখাপড়া বিক্রি করে আর সামান্য রোজগারও হয় না, যদি নতুন কিছু না করি, আমরা সবাই না খেয়ে মরব।’
বৃদ্ধ প্রধান সন্দেহভরা চোখে তাকালেন।
কিনিউত নির্ভয়ে সোজাসুজি তাকিয়ে রইলেন।
বৃদ্ধ প্রধান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, ‘‘চেষ্টা ভালো, কিন্তু জমি নেই, চাষ করবি কী করে?’’
এবার কিনিউত হতবাক।
জমি নেই?
বৃদ্ধ প্রধান তাঁকে নিরুৎসাহিত করতে চান না, তবুও স্পষ্ট করে বলতে বাধ্য।
‘‘বাইরের মানুষ জমির দস্তাবেজ পায় না।’’
কিনিউত তাড়াতাড়ি বললেন, ‘‘আমি তো এখানকারই...’’ কথা শেষ করেই থেমে গেলেন।
তিনি তো এখন পরের বাড়ি, আসলে আর কিনি পরিবারের সদস্য নন, তাছাড়া, মেয়েদের নিজ নামে জমি পাওয়ার অধিকার নেই।
এবার তিনি দুশ্চিন্তায় পড়লেন।
‘‘চাচা, কোনো উপায়ই নেই?’’
বৃদ্ধ প্রধান মাথা নেড়ে দিলেন।
একপাশে থাকা প্রতিবেশী বৃদ্ধ হঠাৎ বললেন, ‘‘উপায় আছে, কিন্তু সাহস দেখাতে হবে।’
কিনিউত কিছু বলার আগেই বৃদ্ধ প্রধান গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে বললেন, ‘‘ওটা চলবে না!’’
‘‘কী উপায়?’’ কিনিউত কৌতূহলভরে জানতে চাইলেন।
প্রতিবেশী বৃদ্ধ প্রধানের নিষেধ উপেক্ষা করে বললেন, ‘‘জঙ্গল সাফ করা।’’
এই দুটি শব্দ বের হতেই বৃদ্ধ প্রধান রেগে উঠলেন, ‘‘শত্রুতা আছে নাকি? ওকে আগুনে ঠেলে দিচ্ছো কেন!’’
একটি পরিবার এমনিতেই বিপদে, নতুন বিপদ আর দরকার নেই।
তবে বৃদ্ধ প্রধান নিশ্চিন্ত, কেউ বোকা না হলে জঙ্গল সাফ করতে চাইবে না।
‘‘জঙ্গল সাফ করে জমি পেলে, আমি রাজি!’’